Skip to content

বরেণ্য লেখক ইসহাক কাজল আর নেই:শোকাহত বিলাতের সাহিত্যপাড়া

জাহেদ জারিফ
বিলাতের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অভিভাবকতুল্য বর্ষিয়ান সাহিত্যিক,বিপ্লবী রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক ইসহাক কাজল লন্ডনস্থ কুইন্স হাসপাতালে রোজ সোমবার স্থানীয় সময় ৫টার সময় মৃত্যুবরণ করেন।মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৭২ বছর।রাজনীতির মাঠ আর সাহিত্যের পাঠ দুটিই ছিলো তাঁর দখলে।ইসহাক কাজল প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে কর্ম জীবন শুরু করলেও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মি হিসেবে পুলিশি হয়রানির শিকার হয়ে দীর্ঘ দিন আত্মগোপনে থাকায় চাকরি হারাতে হয়।তিনি আজীবন গণমানুষের পক্ষে লড়েছেন।তাঁর রাজনীতি ছিলো সমাজের নিপিড়ীত,নির্যাতিত অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য নিবেদিত।সমাজের প্রান্তিক মানুষের কাছে তিনি ছিলেন ভরসাস্থল।১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ সহ ১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলন,১৯৬৬’র ৬ দফা আন্দোলন,১৯৬৯ সালের গণআন্দোলন সহ প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে তিনি সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন।রাজনৈতিক জীবনে স্বাধীনতাত্তোর সময়ে সিলেট জেলা আওয়ামীলীগের শ্রম সম্পাদক;সিলেট জেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক; সিলেট জেলা শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি;সিলেট জেলা সংবাদপত্র হকার ইউনিয়ন ও সমবায় সমিতির সভাপতি;সিলেট জেলা রিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক;বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য;ওয়াকার্স পার্টি সিলেট জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন।একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যুক্তরাজ্য শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি,বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ যুক্তরাজ্য ইউনিট কমান্ডের নির্বাহী সদস্য।এছাড়া তিনি সিলেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আন্দোলন,সিমিটারা বিরোধী আন্দোলন,সিলেট বিভাগ আন্দোলন সহ নানা আন্দোলন সংগ্রামে সম্পৃক্ত ছিলেন।আপাদমস্তক একজন রাজনীতিবিদ হওয়া সত্ত্বেও তিনি সাহিত্য ও সাংবাদিকতায়ও ছিলেন সমুজ্জ্বল।১৯৬৯ সালে গণমানুষের কবি দিলওয়ার`সমস্বর লেখক ও শিল্পী সংস্থা’গঠন করলে তিনি এটির যুগ্ন সম্পাদক নির্বাচিত হোন।১৯৭৮ সাল থেকে পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন।সাপ্তাহিক সিলেট কন্ঠ,সাপ্তাহিক নতুনকথা,দৈনিক রানার,সাপ্তাহিক জালালাবাদ,সাপ্তাহিক যুগভেরী,সাপ্তাহিক সিলেট সমাচার,সাপ্তাহিক খবর ও দৈনিক জালালাবাদী পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি,দৈনিক খোলাচিটির বার্তা সম্পাদক,দৈনিক মৌলভীবাজার বার্তার নির্বাহী সম্পাদক এবং দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার প্রথমে কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি,পরে সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি এবং ২০০০ সাল থেকে লন্ডন প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।তিনি ১৯৯৬ সালে বাংলাবাজার পত্রিকার দেশ সেরা প্রতিনিধি নির্বাচিত হোন।২০০০ সালে স্বপরিবারে লন্ডনে স্থায়িভাবে বসবাসের জন্য চলে আসেন এবং তখন থেকেই তিনি বিলাতের প্রাচীনতম বাংলা সংবাদপত্র সাপ্তাহিক জনমতের সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার এবং পরবর্তিতে পলিটিক্যাল এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।এছাড়াও তিনি বিলাত থেকে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা তৃতীয় ধারার প্রধান সম্পাদক ছিলেন।১৯৮৫-৮৬ সালে সিলেট প্রেস ক্লাবের কার্যকরী পরিষদের সদস্য,কমলগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি(১৯৯৯-২০০১),বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি শ্রীমঙ্গল ইউনিটের সহ সভাপতি(১৯৯-২০০১),লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের নির্বাহী কমিটির তিন মেয়াদের নির্বাচিত তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং একবার প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।তাঁর লেখনির মূল শক্তিই ছিলো মেহনতি জনতা।তাঁর বর্ণাঢ্য লেখক জীবনে শ্রমজীবি মানুষই প্রধান চরিত্র হিসেবে স্থান পায়।মুক্তিযুদ্ধ বিষয়েও তিনি বহু গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেন।সম্পাদনা সহ তাঁর মৌলিক গ্রন্থের সংখ্যা ২১।তন্মধ্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো-“সুরমা উপত্যকার চা শ্রমিক আন্দোলন:অতীত ও বর্তমান”,”সিলেটের শিল্পী সাধক সংগ্রামী”,”The workers movement in the surma valley “বাংলাদেশের তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ:বিদেশি আগ্রাসন”,”বাঙালি ও বাংলাদেশ “,”জনক তুমি বাংলাদেশ”,”ক্ষমতায়ন ও বাংলাদেশ”,”বীরাঙ্গনাদের জীবন সংগ্রাম”মুক্তিযোদ্ধারা সংগ্রামে সংকটে”,বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী একটি নির্মোহ জীবনালেখ্য” ইত্যাদি ।ইসহাক কাজল ১৯৪৮ সালের২৮ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ জন্ম গ্রহণ করেন।সাংবাদিক,লেখক এবং রাজনীতিক ইসহাক কাজলের এই তিন সত্ত্বার প্রত্যেকটিতেই তৃণমূল মানুষের সম্পৃক্ততা কল্পনাতীত।প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ তিনি ২০১৩ সালে বাংলা একাডেমি প্রবাসী লেখক পুরস্কারে ভূষিত হোন।

ইসহাক কাজল

%d bloggers like this: