নৃশংস এক উৎসব থেকে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস

আজ হতে কয়েক শতাব্দী পূর্বে ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখে এক নৃশংস ঘটনা ঘটত। ‘লুপেরা সালি’ নামক একটি রোমান উৎসবে এই দিনে নারীদের প্রথমে অত্যাচার করা হতো এবং পরবর্তীতে শারীরিক মিলনে বাধ্য করা হতো।

‘লুপেরা সালি’ উৎসবে এই তারিখে নারীদের সন্তান ধারণের ক্ষমতার প্রচার প্রচারণা করা হতো। পরবর্তীতে যদিও এই তারিখটি ‘ভালোবাসা’ শব্দটির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। তবে এর শুরুটা অত ভালোবাসা পূর্ণ ছিল না বরং এর সাথে জড়িত ছিল এক নৃশংস উপাখ্যান।

এইদিনে প্রথমে নারীদের মৃত পশুর কাঁচা চামড়া দিয়ে তৈরি চাবুক দিয়ে বেত্রাঘাত করা হতো। তৎকালীন সময়ে সকলে বিশ্বাস করত যে, এর মাধ্যমে নারীরা কোনো জটিলতা ছাড়াই সন্তাত ধারণ করবে এবং পরবর্তীতে খুব সহজেই সন্তান প্রসব করতে পারবে। 

এই উৎসবের বীভৎসতা এখানেই শেষ হয়ে যায় না বরং একটি লটারির মাধ্যমে সঙ্গীর সাথে জোড়া বাধার জন্য বাধ্য করা হতো। এবং পুরো উৎসব শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত সেই সঙ্গীর সাথে নারীদের দৈহিক মিলন করে যাওয়া লাগত।

খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে এই বীভৎস উৎসব ‘লুপেরা সালি’ এর সূচনা হয়। তখন বেশ কয়েকজন রোমান পাদ্রী একসাথে নগ্ন হয়ে প্রথমে যৌনতাকে উৎসর্গ করে ছাগল বলি দিত এবং এরপর কুকুর বলি দিত শুদ্ধতাকে উৎসর্গ করে। এদের মধ্যে দুইজন পাদ্রী সেই রক্তেমাখা ছুরি থেকে রক্ত নিয়ে নিজেদের কপালে লাগাতেন এবং এরপর দুধে ভেজা উলের কাপড় দিয়ে সেটা মুছে নিতেন।

এই বলি শেষ হয়ে গেলে উৎসবটির আরো অন্ধকার দিক বের হয়ে আসত। পাদ্রীরা তখন মৃত পশুর চামড়াকে কেটে লম্বা আকার দিত এবং সেগুলো রক্তে ভিজিয়ে রাখত। উল্লেখ্য যে, সেই রক্তগুলোকে আশীর্বাদের মাধ্যমে পবিত্র করে নেয়া হতো। পরবর্তীতে সেই চাবুকের মতো মৃত পশুর চামড়া হাতে পাদ্রীরা রাস্তায় বের হয়ে যেতেন, যেখানে বিভিন্ন নারীরা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত এবং পাদ্রীরা এসে সেই নারীদের বেত্রাঘাত করতেন। নারীরাও স্বেচ্ছায় এবং নীরবে এই অত্যাচার সহ্য করে নিতেন। কেননা তারা বিশ্বাস করতেন এর মাধ্যমে তারা নিরাপদভাবে সন্তান ধারণে সক্ষম হবেন।

ভুকোভিক নামক একজন শিক্ষাবিদের মতে, এই উৎসবটি মূলত করা হতো যাতে করে নারীদের সন্তান ধারণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কেননা তৎকালীন সবাই মনে করত, কোনো নারী যদি পাদ্রীদের হাতের এই চাবুকের ঘা খায় তাহলে সে অনেক বেশি সন্তান ধারণ করতে পারবে। তৎকালীন সময়ে নারীরা এই প্রথা এতটাই বিশ্বাস করতেন যে, তারা শরীরের যেই অংশে চাবুক মারা হবে সেখান থেকে কাপড় পর্যন্ত সরিয়ে নিতেন যাতে চাবুকের ঘা সরাসরি শরীরে আঘাত করতে পারে।

চাবুক দিয়ে বেত্রাঘাত করা যখন শেষ হয়ে যেত তখন কথিত আছে যে, সঙ্গী খুঁজে নেয়ার লটারি শুরু হয়ে যেত। সকল অবিবাহিত নারীদের নাম একটি পাত্রের মধ্যে রেখে সেই পাত্র থেকে অবিবাহিত পুরুষদের একটি নাম উঠিয়ে নেয়ার জন্য বলা হতো। এভাবেই এই লটারির মাধ্যমে সঙ্গীর সাথে জোড়া বাধতে হতো নারীদের এবং পুরো উৎসবের সময় পর্যন্ত তারা এই সঙ্গীর সাথেই থাকতেন।

অনেক ঐতিহাসিকের মতে, এই উৎসবের মধ্যে সঙ্গীর সাথে জোড়া বাধার পর তার সাথে দৈহিক মিলনেও বাধ্য করা হতো নারীদের। যতই দিন গড়াতে লাগল ততই এই উৎসবের মহাত্মতা বৃদ্ধি পেতে থাকল এবং রীতিনীতির মধ্যেও চলে আসল বেশকিছু পরিবর্তন। তখন আর পাদ্রীদেরকে নগ্ন হতে হতো না এবং নারীদেরকেও শুধুমাত্র তাদের হাতের মধ্যেই আঘাত করা হতো। এমনকি এই নগ্ন হওয়ার প্রচলন, পোপ গেলাসিয়াসের এই উৎসবকে ধর্মীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করার সাথে সাথেই বিলুপ্ত হয়ে যায়।

কিছুদিন আগেই নেটফ্লিক্স এর তৈরি করা ‘দ্য চিলিং অ্যাডভেঞ্চার অব সাবরিনা’ নামক একটি টিভি সিরিজের মধ্যে এই উৎসবের বেশকিছু রীতিনীতি দেখানো হয়েছিল। টিভি সিরিজটি অবশ্য ঐতিহাসিক পটভূমি থেকে কিছুটা সরে গিয়ে উৎসবের অনেক কিছু দেখিয়েছে নিজস্ব আঙ্গিকে।

সে যাই হোক, রোমান এই উৎসবের তারিখ ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি এবং পরবর্তীতে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামে এর নামকরণ করা হয়। একটি তথ্য অনুযায়ী জানা যায় যে, সেন্ট ভ্যালেন্টাইন একজন রোমান পাদ্রী ছিলেন এবং তিনি তৎকালীন তরুণ-তরুণীদের মধ্যে গোপনে বিয়ে দিতেন।

আর এই গল্পটা শুরু হয় খ্রিস্টাব্দ ২৬৮-২৭০ এর দিকে ক্লডিয়াস ২ এর শাসনামলে। ক্লডিয়াস মনে করতেন অবিবাহিত পুরুষরা বিবাহিত পুরুষদের থেকে ভালো সৈন্য হতে পারে। আর তাই তিনি তখন তরুণদের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেন। আর ঠিক তখনই সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের এই চমৎকার কাজটির সূচনা। যদিও দুর্ভাগ্যবশত তিনি এমন এক জোড়া তরুণ-তরুণীর মধ্যে বিয়ে দেয়ার সময় ধরা পড়েন।

ক্লডিয়াসের আইন অমান্য করার জন্য সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে আটক করে জেল দেয়া হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ক্লডিয়াসের এই আইন অমান্য করার পাশাপাশি খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণের ব্যাপারেও অনেককেই উৎসাহ দিয়েছিলেন ইতোপূর্বে। এমনকি জেলের মধ্যে থেকেও সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ক্লডিয়াসকেও ধর্ম রূপান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান হয়ে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। এতে রোমান রাজা সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের প্রতি ক্ষুব্ধ হন এবং তাকে তার ধর্মবিশ্বাস থেকে সরে আসার ব্যাপারে জোর করেন। ক্লডিয়াস তখন সেন্ট ভ্যালেন্টাইনকে বলেন, হয় তাকে নিজের ধর্মবিশ্বাস থেকে সরে আসতে হবে অথবা মৃত্যুবরণ করতে হবে।

ইতিহাসবিদদের মতে, জেলে থাকা অবস্থায় ভ্যালেন্টাইনের সাথে জেলারের কন্যার সখ্যতা গড়ে ওঠে। মৃত্যুর পূর্বে তিনি সেই জেলারের কন্যার জন্য একটি চিঠি লিখে যান, যেখানে লেখা ছিল ‘ফ্রম ইয়োর ভ্যালেন্টাইন’।

এই বিখ্যাত সেন্ট ভ্যালেন্টাইনই ভ্যালেন্টাইন’স ডে’র প্রচলন ঘটান বলে প্রচলিত আছে। আর কথিত আছে, সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যু হয়েছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। এভাবেই একটি বীভৎস উৎসব ধীরে ধীরে চমৎকার ভালোবাসাপূর্ণ একটি দিবসে রূপান্তরিত হয়ে যায়।

ইকবাল মাহমুদ ইকু

Advertisements

One thought on “নৃশংস এক উৎসব থেকে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস”