Advertisements
Skip to content

এইতো আমার ঠিকানা। হোসেন আহমদ

5E33D8A1-B259-4BA1-B2EC-A92E64684CD3

হোসেন আহমদ

এম সি অ্যাকাডেমি’তে আমি যখন দশম শ্রেণির ছাত্র তখন থেকেই রাণাপিং এলাকায় একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা জাগে একটি দুঃখবোধ থেকে। বিষয়টি হলো, তখন আমাদের স্কুলে জেনারেল সেক্রেটারি (জি এস) মনোনীত হবেন দশম শ্রেণি থেকে। আমি একদিন আমার বন্ধু ফারুককে বলে ফেললাম, ‘ফারুক তোকে আমি জিএস বানাবো। সেদিন ফারুক শুধু বলেছিল, ‘পাগলামী করবি না’। আমার কথায় আমি অটল থাকি এবং স্কুলের প্রতিটি ক্লাসের সাথে আলাপ করে আমরা এ ব্যাপারে সকলে একমত হয়ে যাই। তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে আমরা পারলাম না। আমাদের প্রধান শিক্ষক তাঁর নিজ ক্ষমতা বলে আমাদের রায় ডিঙ্গিয়ে অন্য একজনকে জিএস মনোনীত করেন। সেদিন অসহায়ভাবে এ পরাজয়কে বরণ করে ফারুককে বলেছিলাম, আমাদের এলাকায় একটি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজ চালিয়ে যেতে। ফারুক এম সি আ্যাকাডেমির জেনারেল সেক্রেটারি না হওয়াতে তার কোন দুঃখবোধ ছিল না। কারণ, তার পক্ষে আমিই সব কিছু করেছিলাম, দুঃখটা ছিল আমার। পরবর্তীকালে এস এস সি পরীক্ষা দেবার পর আমি ও ফারুক পাঠশালায় এবং নিজ নিজ বাড়িতে বিনা বেতনে এলাকার অনেক ছেলেমেয়েকে আমাদের সাধ্যমত শিক্ষাদান করেছি। কলেজে ভর্তি হবার পর ফারুক থাকতো রাজার গলিতে আর আমি কখনো কলেজ হোস্টেলে আবার কখনো দাড়িয়া পাড়ায় মামার বাসায়। তখনও আমরা প্রায়ই একত্রে মিলিত হয়ে কিভাবে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা যায় এ নিয়ে আলাপ করতাম। এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে আমি, ফারুক ও সাদিক তিনজনই যখন বেকার তখন চৌঘরী গোয়াসপুর প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক বলতে জনাব রিয়াজ উদ্দিন ও সোনাওর আলী সাহেব। আমাদের বেকার দেখে রিয়াজ ভাই তাঁকে স্কুলে সাহায্য করার আহবান জানান। আমি তখন প্রাইমারি স্কুলের ছাত্রী প্রবাসী আব্দুল খালিক সাহেবের মেয়েকে প্রাইভেট পড়াতাম। ফলে রিয়াজ ভাইয়ের কথায় আমরা তিনজনই স্কুলে অবৈতনিক শিক্ষকতায় যোগদান করি। দুঃখের বিষয় যে, তখন প্রধান শিক্ষককের বসার মতো স্কুলে একখানা চেয়ারও ছিল না। আমরা তিনজন রমজান মাসে টিউশনি করে প্রাপ্ত টাকা দিয়ে প্রধান শিক্ষকের জন্য এখানা চেয়ার, অফিস কক্ষের ছাদ ও ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটি পাকা প্রস্রাবখানা বানিয়ে দেই। ফারুক ও আমার পরিকল্পনা ছিল এভাবে সমাজকর্ম করে এলাকাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা ও স্কুলের ভালো রেজাল্ট দেখিয়ে একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করা। একই সময় আমরা একটি পোস্ট অফিস প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালিয়ে উপযুক্ত জায়গার অভাবে ব্যর্থ হই এবং এ ব্যাপারে সংগৃহীত অর্থ দাতাদের ফেরত দেই; যে চাঁদার দেড়শ’ টাকা এখনো আমার কাছে আছে।
সম্ভবত ১৯৮৩ সালে সাদিক বিদেশ চলে যায় এ সময় জনাব আব্দুল খালিক লন্ডনি দেশে আসেন। আমি উনার মেয়েকে প্রাইভেট পড়াবার সূত্রে একদিন তাঁর কাছে হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার বিষয়টি তুলি তিনিও এ ব্যাপারে বেশ আগ্রহ দেখান। ফলে ফারুককে নিয়ে লন্ডনি সাহেবের সঙ্গে আলোচনা করি। স্মরণ আছে তখন ফারুক আমাকে বলেছিল, ‘হোসেন, তুইতো স্কুলের জন্য আর্থিকভাবে অনেক কিছুই করতে পারবে, আমার পক্ষে দেয়ার মতো কিছুই দেখছিনা।’ উত্তরে বলেছিলাম, ‘তোর বিচক্ষণতা ও পরিশ্রমই আমাদের দরকার’। ইচ্ছা ছিল আমার পিতা লন্ডন থেকে দেশে আসার পর আমি জায়গা অথবা একটা ঘর বানিয়ে দেব। কিন্তু পারলাম না, আমার প্রাণপ্রিয় পিতা দেশে আসার কিছুদিন পরই ইন্তেকাল করেন। ফলে আমি সম্পণূরূপে অসহায় হয়ে পড়ি। সে যাক, তখন আমরা একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার সুর জোরেসুরে তুলতে সক্ষম হয়েছিলাম। এ বিষয়ে তখন বেশ কয়েকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাগুলোতে আমাদের ডাকে এলাকার যে সকল শিক্ষানুরাগী মুরব্বীগণ সাড়া দিয়ে ছিলেন তাঁদের অনেকেই আজ আমাদের মধ্যে নেই। এঁরা হলেন: মরহুম জয়াইদ আলী, হাজি আব্দুল মনাফ, জনাব ফুরকান আলী (কটাই মিয়া) ও খন্দকার ফখর উদ্দিন।
১৯৮৪, ৮৫ ও ৮৬ সালে আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে যারা এ পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিয়ে যান তাঁরা হলেন: জনাব ওদুদ ওদুদ, মাখন মিয়া, হেলাল উদ্দিন আহমদ প্রমুখ। এ সময়কার সভাগুলোকে সাফল্যম-িত করতে যাঁরা অত্যন্ত পরিশ্রম করেন তারা হলেন: জনাব আব্দুল হেকিম, শওকত আলী, আবুল কালাম ও মাসুক মিয়া। এরা ঘরে ঘরে গিয়ে এলাকাবাসীকে সভায় নিয়ে আসতেন। সে সকল সভার বিবরণ এখন কার কাছে আছে জানিনা, তবে সভাগুলো পরিচালনার দায়িত্ব ছিল ফারুকের উপর, বেশির ভাগ কার্যবিবরণী সে’ই লিখেছে; রিয়াজ ভাই ও সিরাজ মিয়া মাস্টার (সিরাজুল ইসলাম) সাহেবও লিখেছেন। সুতরাং এগুলো তাদের ঘরে থাকতে পারে। তখনকার সভাগুলোতে যাঁরা সভাপতিত্ব করেন এবং এখনও জীবিত আছেন তাঁরা হলেন: হাজি নিসার আলী, আব্দুল খালিক লন্ডনী, মৌলানা শওকত আলী প্রমুখ। উল্লিখিত কোনো এক সময়ে আব্দুল খালিক সাহেব চৌঘরী বাজারে স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন কিন্তু জমিটি ডি সি’র খতিয়ানে থাকায় প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। পরে তিনি তাঁর পাশের বাড়ির লোকদের নিয়ে একটি সমিতি গঠন করেন। কিছুদিন পর রায়গড় সরকারি প্রাইমারি স্কুলে হাইস্কুল প্রতিষ্ঠার দাওয়াত পাই, আমার যাওয়া সম্ভব হয় নি। সভাতে ফারুক গিয়েছিল এবং তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সভাটি প- হয়ে যায়। পরবর্তীকালে ফারুকের নিকট থেকে বিস্তারিত জানতে পারি। এমতাবস্তায় অনেকদিন গত হওয়ার পর সাদিক বিদেশ থেকে আসে এবং তাকে দেখতে যাই। এ সময় সে ফারুকের কাছে জানতে চায় স্কুল প্রতিষ্ঠার কী হলো? এ সময় আমরা জমির অভাবসহ বিস্তারিত আলাপ করি। সে তার স্বপ্নের কথাও আমাদেরকে বলে। পরে একদিন চৌঘরী গোয়াসপুর প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক রিয়াজ ভাই আমাকে স্কুলে যাবার জন্য ডেকে পাঠান আমি স্কুলে গিয়ে ফারুক ও সাদিককে দেখতে পাই। তখন আমদের তিনজনকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন: ‘তোমরা সবাই হাইস্কুল করতে ব্যর্থ হয়েছ, এখন আমি যদি আমার স্কুলের পাশে ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণি আরম্ভ করি তোমরা কি আমাকে সাহায্য করবে?’ আমরা উনার কথায় সাড়া দেই এবং কিভাবে আরম্ভ করা যায় তার উপায় খুঁজতে থাকি। এ সময় জনাব আব্দুল খালিক সাহেব দেশে ছিলেন, উনাকে খবর দিয়ে এনে বিস্তারিত আলাপ করি এবং স্কুলের পাশে বাঁশবেত দিয়ে ঘরের ব্যবস্থা করা হয়। আমি বলেছিলাম যে টাকা খরছ হবে তা আমি দেব। এছাড়া সরকারি প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস আরম্ভ করতে হলে টিও অথবা এটিও-এর পারমিশন দরকার। এ দায়িত্ব নেন রিয়াজ ভাই। ফারুককে দায়িত্ব দেয়া হয় খালিক সাহেবের কাছ থেকে জমি উদ্ধার করার এবং এ ব্যাপারে এলাকাবাসীকে ডেকে একটি সভা আহবান করার। পরবর্তী কোনো এক সভায় আমরা সিদ্ধান্ত নেই জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে সম্ভবত ১তারিখ ছাত্রছাত্রী ভর্তি করে কাঁচাঘর বানানোর পূর্বে প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস চালিয়ে যাবার। তখন আমি ব্যবসায়ে জড়িয়ে গেছি তাই আমরা ফারুককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে ছাত্রছাত্রী ভর্তির কাজ আরম্ভ করি।
ছাত্রছাত্রী ভর্তি করার পূর্বে আমাদের সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য আমরা একটি সভার আয়োজন করি। এ সভায় ফারুক আমাদের এ পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করে যে, আমরা বাঁশবেত দিয়ে স্কুল আরম্ভ করতে যাচ্ছি। তখন জনাব আব্দুল ওদুদ বলেছিলেন স্কুলের জন্য টিন কে দেবেন? আমি তখন দুই বান্দ টিন দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে জনাব মাখন মিয়া এক বান্দ ও তমজ্জুল আলী (তুতা মিয়া) দুই বান্দ টিন দানের ঘোষণা দেন। ওদুদ ভাই বলেছিলেন খাতা ও ব্যানারের কাপড় তিনি দেবেন। তখন ফারুক আমাকে একটি কাগজে, ‘রানাপিং উচ্চবিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী ভর্তি চলিতেছে’ কথাগুলো লিখে দিয়ে ব্যানারটি অরুনকে ( গোলাপগঞ্জ বাজারে, অরুন ফটো স্টুড়িও’র এক্স ও আর্টিস্ট) দিয়ে লিখিয়ে দেবার অনুরোধ জানায়, আমি অরুনের দ্বারা ব্যানারটি লিখিয়ে দিয়ে ছিলাম। পরবর্তীকালে স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পূর্বে আহুত একটি সভায় আমাদের বন্ধু ফুলবাড়ি নিবাসী মুবিন আহমদ জায়গীরদারের প্রস্তাবে স্কুলের উক্ত নামের সঙ্গে ‘আদর্শ’ শব্দযোগে নামকরণ করা হয়, ‘রাণাপিং আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়’।
স্কুল আরম্ভ হবার পরপরই এলাকা থেকে বাঁশ সংগ্রহ করায় ঝাপিয়ে পড়েন: জনাব আব্দুল হেকিম, মাসুক মিয়া, আবুল কালাম, শওকত আলী, জিয়া উদ্দিন ও সাদিক আহমদ। জনাব জিয়া উদ্দিন সাহেব নিজে দাড়া এনে বাঁশবেত দিয়ে স্কুলের প্রথম ঘরটি বানিয়ে দেন। তাঁকে সাহায্য করেন অন্যান্য শিক্ষানুরাগীরা। এ সময় স্কুলের জন্য একটি ম্যানেজিং কমিটি ও একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠিত হয়েছিল। এ দু’টি কমিটির সদস্যগণ ছিলেন আমাদের মনোনীত। আমার যতটুকু মনে পড়ে সম্ভবত উপদেষ্টা কমিটিতে ছিলেন: জনাব আলা উদ্দিন, হাজি নিসার আলী, হাজি তেরা মিয়া ও জনাব আব্দুল খালিক। বাকি নামগুলো আমার স্মরণে আসছেনা। তবে এর একটি তালিকা ফারুকের কাছে ছিল।
স্কুলের কাঁচা ঘরটি তৈরি করা হয়েছিল পশ্চিম দিকের আইডিএ কক্ষের পাশে। এর পূর্বে রিয়াজ ভাই ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণির জন্য এইডিএ কক্ষ ও অফিস রুমটি আমাদের জন্য ছেড়ে দেন। পরবর্তীকালে ফারুকের পূর্ববর্তী আলোচনার সূত্রে একটি সভায় আব্দুল খালিক লন্ডনি প্রাইমারি স্কুলের সম্মুখভাগস্থ মসজিদের দক্ষিণ পাশের জমিটি স্কুলের জন্য দান করেন। আমরাও জায়গাটিতে খুঁটি দিয়ে চিহ্নিত করি। কিন্তু তাঁর অংশীদারগণ রাজী না হওয়াতে পরবর্তীকালে ফারুকের সঙ্গে আলোচনা করে বর্তমান জাগয়াটি দান করেন। এই জমি দানের পূর্ব থেকেই ছাত্রছাত্রী ভর্তি ও ক্লাস চলছিল। তখন শিক্ষক ছিলেন: ফারুক আহমদ, বদর উদ্দিন (টুনু মিয়া), আসমান উদ্দিন, সাদিক আহমদ, মৌলানা আব্দুল লতিফ ও আমি। মাঝেমধ্যে হেলাল উদ্দিন আহমদ (মেম্বার) ও আসতেন। তখন পর্যন্ত জনাব আব্দুল মুকিত স্কুলে যোগদান করেন নাই। তাঁকে স্কুলে আনার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল রিয়াজ ভাইকে। তিনি যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হওয়ায় আমরা ফারুককে এ দায়িত্ব দিই। সে তাঁকে স্কুলের শিক্ষক হিসেবে আসতে রাজী করায়। সম্ভবত তিনি স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিন প্রথম আসেন। সেই থেকে রণকেলী ‘গোলাপ কুঁড়ি শিশু বিদ্যালয়’-এর ক্লাস শেষ করে আমাদের স্কুলে আসতেন। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর জনাব খয়ের উদ্দিন আহমদ (চুনু মিয়া) স্কুলের সঙ্গে যুক্ত কয়েক জনের কাছে প্রস্তাব করেন, স্কুল ঘরটি বাঁশবেত দিয়ে বানানোর পরিবর্তে পাকা করে বানানোর। তিনি এও প্রস্তাব করেন যে, স্কুল ঘরের জন্য প্রয়োজনীয় সিমেন্ট তিনি দেবেন। এছাড়া চাঁদা তুলে ইট, রড ইত্যাদি সংগ্রহেও সাহায্য করবেন। এতে নতুন করে আমাদের মধ্যে উৎসাহের সৃষ্টি হয়। তখন নতুন করে ম্যানেজিং কমিটি গঠন করার প্রয়োজন আমরা অনুভব করি এবং একটি সভা আহবান করি। সভায় সভাপতিত্ব করেন হাজি নিসার আলী। সভায় আব্দুল খালিক লন্ডনী সাহেব সহ-সভাপতি হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেন এবং প্রস্তাবটি সমর্থন করেন মাখন মিয়া (মেম্বার)। কিন্তু জনাব তেরা মিয়া প্রস্তাব করেন খয়ের উদ্দিন (চুনু মিয়া)-এর নাম। প্রস্তাবটি সমর্থন করি আমি। এতে যদিও দুঃখ পেয়েছিলেন আব্দুল খালিক লন্ডনি সাহেব, মাখন মিয়া ও ফারুক; কিন্তু এত বড় দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এমনকি তখন আমি কোনো পদের কথা চিন্তাও করি নাই।
আমরা পূর্ণাঙ্গ ম্যানেজিং কমিটি গঠন করেই নতুন স্থানে ঘর বানানোর জন্য দিন-তারিখ ঠিক করে ফেলি। তখন যদিও সভাপতি হিসেবে জনাব খয়ের উদ্দিন আহমদকে নির্বাচিত করা হলেও তিনি নিজে তা জানতেন না। আমরা তাঁর অনুপস্থিতিতে এ সব করেছিলাম। ঠিক তেমনি আরো অনেককে এভাবে আমরা ম্যানেজিং কমিটিতে এনেছি। আমি কারো অবদানকে খাটো করে দেখছি না, কারণ যে যার অবস্থান থেকে প্রাণপন চেষ্টা করেছেন স্কুলটি হওয়ার জন্য।
স্কুল আরম্ভ হওয়ার একমাস পরে, ১৯৮৭-এর ৫ ফেব্রুয়ারি ‘রাণাপিং আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুল হক (তানু মিয়া)। সেদিন বিরাট সভা হয়েছিল। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক জনাব মছরুছুল করিম চৌধুরী সভা শেষে, ‘চৌঘরী গোয়াসপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে’ নতুন স্কুলের আনুষ্ঠানিক ক্লাস উদ্বোধন করেন। এই দিন আমার শ্রদ্ধেয় তালই মরহুম আব্দুল মজিদকে (ময়না মিয়া) স্কুলের জন্য একটি কক্ষ করে দেবার অনুরোধ করেছিলাম আমি, তমজ্জুল আলী (তুতা মিয়া) ও আলা উদ্দিন চাচা। তিনি আমাদের এ অনুরোধ রেখেছিলেন। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তাঁর নামের হলটি এখনো আছে।
সভা শেষে অনুষ্ঠিত চা-চক্রে আমার বন্ধু ফুলবাড়ি নিবাসী মহি-উস-সুন্নাত চৌধুরী (নার্জিস) এক হাজার টাকা চাঁদা দানের প্রতিশ্রুতি দেয়। এছাড়া, সিলেটের বিভিন্ন স্থানের মানুষের সহযেগিতা দানে ও জনাব খয়ের উদ্দিন আহমদ চুনু মিয়ার তদারকিতে স্কুলের নতুন পাকা গৃহটির কাজ আরম্ভ হয়। তাঁকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করেন জনাব আলা উদ্দিন, আব্দুল মুকিত-সহ আরো অনেকে। জনাব আলাউদ্দিন নিষ্ঠার সঙ্গে অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে চাঁদা চাইতেন। তখন তমজ্জুল আলী (তুতা মিয়া) ভাইয়ের টাকা অত্যন্ত কাজে এসেছে। সময়ে অসময়ে যখন যেখানে দরকার তিনি নির্দ্বিধায় টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। এছাড়া জনাব খয়ের উদ্দিন আহমদ (চুনু মিয়া) স্কুলটিকে তাঁর নিজের বাড়ি হিসেবে মনে করেই সব কজের তদারকি করেছেন। আমার মনে হয় স্কুলের প্রতিটি ইটের সঙ্গে তাঁর পরিচয় আছে। উনার পরিশ্রম কারো ভুলার কথা নয়। আমিও আমার সাধ্যমত তাঁকে সহযোগিতা করেছি। স্কুলের আরম্ভ থেকে নতুন স্কুল গৃহে পাড়ি দেবার অর্থাৎ স্কুল সরকারি অনুমোদন লাভের পূর্ব পর্যন্ত আমরা ‘চৌঘরী গোয়াসপুর সরকারি প্রাইমারি স্কুল’-এর ডেক্স, বেঞ্চ ও ব্লাকবোর্ড ইত্যাদি ব্যবহার করেছি। প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক অকাল প্রয়াত জনাব রিয়াজ উদ্দিন আহমদ যদি সার্বিকভাবে এসব সহযোগিতা না দিতেন তাহলে আজ এ স্কুলটি হতো কিনা আমার সন্দেহ হয়।
স্কুল বর্তমান স্থানে আসার পর আমি আর শিক্ষকতা করি নাই। তখন আমার উপর চাঁদা আরোপ করা হলো প্রতি মাসে পঞ্চাশ টাকা। আমি ও আমার বোন বিলকিস বেগম এবং আরো অনেকে পঞ্চাশ টাকা করে চাঁদা দেবার ফলে নতুন শিক্ষক রাখা হয়। পরের বছর ফারুক ব্যবসায়র কাজে ছাতক চলে যায় এবং এর পরে ছাতক থেকে সোজা লন্ডন অভিমুখে যাত্রা করে। শুধু আমাদের প্রাণপ্রিয় বন্ধু সাদিক আহমদ সুখে-দুঃখে স্কুলে থেকে যায় এবং এখনও শিক্ষক হিসেবে আছে। সে যতদিন স্কুলে থাকবে ততদিন মনে করবো আমরাও স্কুলে আছি। কারণ একজন প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক হিসেবে স্কুলের প্রতি তার যতটুকু দরদ থাকবে ততটুকু হয়তো অন্যকারো থাকাবে না।
এ স্কুলের জন্য আমার এলাকাবাসী টাকা দিয়ে শ্রম দিয়ে ছাত্রছাত্রী দিয়ে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন, এলাকার প্রতিটি মানুষ ছিলেন স্কুলের জন্য নিবেদিত। আমি তাঁদেরকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। স্কুলটি সরকারি অনুমোদন পাওয়ার জন্য তখনকার এম পি জনাব গৌস উদ্দিন আহমদ সাহেবের ভূমিকা ছিল চমৎকার। এছাড়া এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন শিক্ষা সচিব সদ্যপ্রয়াত – জনাব হেদায়েত আহমদ।
১৯৮৭ হতে ২০০০ সাল পর্যন্ত স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্য হয়ে আজ দীর্ঘ দিন পর উক্ত বিদ্যালয়ের স্মৃতি কথা লিখতে গিয়ে বার বার হোচট খাচ্ছি। প্রথমত সন-তারিখ মানুষের নাম সঠিকভাবে মনে হচ্ছে না। দ্বিতীয়ত আমার মায়ের অসুস্থতার জন্য ভাষাগত ত্রুটিটও থেকে যাচ্ছে। সে যাক আজ যখন সুরমা নদীর তীরে সিলেট-জকিগঞ্জ রাস্তার পশ্চিম পাশে অর্থাৎ নদী ও রাস্তার মধ্যভাগে মনোরম পরিবেশে সুন্দর স্কুলটি দেখি তখন আনন্দে মন ভরে উঠে, নিজের অজান্তেই যেন বলে উঠি – এইতো আমার ঠিকানা।

হোসেন আহমদ: রাণাপিং আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক ও সমাজসেবী। লেখাটি`স্মারক ২০০৬ : রাণাপিং আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়’ শীর্ষক স্মরণিকা থেকে সঙ্কলিত।

Advertisements
%d bloggers like this: