Advertisements
Skip to content

রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবী হাফিজ মজির উদ্দিনের জীবনাবসান।

 

জাহেদ জারিফ:
বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবী হাফিজ মজির উদ্দিন সিলেটের নূরজাহান হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ১৬জুন২০২০ রোজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় সকাল ১০ঘটিকায় মৃত্যুবরণ করেন।মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮৫বছর।যুক্তরাজ্যস্থ বাঙালী কমিউনিটির মধ্যে রাজনীতি ও সমাজসেবায় অন্যতম পথিকৃত,আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় লন্ডনে গঠিত ‘শেখ মুজিব ডিফেন্স ফান্ড’-এর ট্রেজারার ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক বিশিষ্ট সমাজসেবী হাফিজ মজির উদ্দিন ১৯৩৫-এর ১৫ অগাস্ট গোলাপগঞ্জ থানার ৫নং বুধবারী বাজার ইউনিয়নের বাঘিরঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা হাজী মমিন আলী ও মায়ের নাম আলিফজান বিবি।হাফিজ মজির উদ্দিন বাঘির ঘাট প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষে ঢাকাউত্তর মোহাম্মদপুর হাফিজিয়া মাদ্রাসা থেকে হাফিজ সনদ লাভ করে ব্যবসার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬২-এর ১৫ জুন ব্যবসা ছেড়ে জব ভাউচারে বিলাত এসে কাজ নেন গার্মেন্টস ফেক্টরিতে। কয়েক বছর পর ৪নং হ্যাসল স্ট্রিট, লন্ডন ই-১ এ টিকানায় আরম্ভ করে হালাল বুচার শপ, ২নং আম্বারস্টন স্ট্রিট লন্ডন ই-১ এর প্রথম তলায় ‘লাহোর কাবাব হাউস’ এবং এর উপর তলায় ‘ফ্রেঞ্চ ট্রেভেল’ নামে ট্রেভেল্স ব্যবসা। আর এভাবেই তিনি তার ব্যবসার বহুমুখি প্রসার ঘটিয়ে যুক্তরাজ্যের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
লন্ডন আসার পরপরই হাফিজ মজির উদ্দিন বাঙালিদের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সমাজ উন্নয়নমূলক সংগঠনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ১৯৬২ সালে নিজ এলাকার উন্নয়নের জন্য গঠিত ‘বাঘিরঘাট উন্নয়ন সমিতি’-এর অন্যতম উদ্যেক্তা এবং প্রতিষ্ঠাকালীন ট্রেজারার নির্বচিত হন। দু’বছর পর ১৯৬৫ সালে নির্বাচিত হন ‘পাকিস্তান ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশান’-এর ট্রেজারার।
হাফিজ মজির উদ্দিন জাতীয় রাজনীতিতে আগমন ১৯৬৬ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে কেন্দ্র করে, পূর্ব পাকিস্তান হাউস পরিচালিত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ১৯৬৮-এর ১০ জুন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমান ও মামলার আসামীদের পক্ষে লন্ডনে আব্দুল মন্নানকে (ছানুমিয়া) চেয়ারম্যান এবং মিনহাজ উদ্দিনকে সেক্রেটারি করে গঠিত হয় ‘শেখ মুজিব ডিফেন্স ফান্ড’। এ ফান্ডের ট্রেজারার নির্বাচিত হন হাফিজ মজির উদ্দিন। তখন যুক্তরাজ্যে আওয়ামী লীগ গঠিত হয় নাই। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান বেকসুর খালাস পাওয়ার পর ১৯৬৯-এর ২৫ অক্টোবার লন্ডনে আসেন এবং প্রবাসীদের স্বদেশপ্রেম ও রাজনৈতিক চেতনাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি তার শুভাকাক্সক্ষী প্রবাসীদেরকে আওয়ামী লীগ যুক্তরাজ্য শাখা গঠনের পরামর্শ দেন। ফলে ১৯৭০-এর ২০ সেপ্টেম্বার আওয়ামী লীগ যুক্তরাজ্য শাখা গঠিত হয়। হাফিজ মজির উদ্দিন ছিলেন এ কমিটির কার্যকরী পরিষদের সদস্য।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেবার পর পরই যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাঙালিরা সে ডাকে সাড়া দিয়ে একাত্বতা ঘোষণা করেন। পরবর্তীকালে ২৫ মার্চ পাকি-হানাদার-বাহিনী বাংলার বুকে বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালালে বিলাতের বাঙালি-সম্প্রদায় এর বিরুদ্ধে গর্জে গঠেন ফলে ১৯৭১-এর ২৭ মার্চ জননেতা গৌস খানকে সভাপতি ও ব্যারিষ্টার শাখাওয়াত হোসেনকে সেক্রেটারি করে লন্ডনে গঠিত হয় ত্রিশ সদস্য বিশিষ্ট ‘কাউন্সিল অর দ্য পিপল্স রিপাবলিক অব বাংলাদেশ ইন ইউকে’ কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন হাফিজ মজির উদ্দিন। ১৯৭১ সালের ১৩ অক্টোবার আব্দুস সামাদ আজাদ-এর সভাপতিত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে আরো শক্তিশালী করার জন্য আব্দুল মন্নানকে (ছানু মিয়া) প্রেসিডেন্ট ও আবুল বসরকে সেক্রেটারি করে গঠিত হয় ‘আওয়ামীলীগ লন্ডন শাখা’। হাফিজ মজির উদ্দিন ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এ কমিটির ট্রেজারার ছিলেন।
সংবাদপত্র সেবায়ও হাফিজ মজির উদ্দিনের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ১৯৭১-এর ১৪ মার্চ ম্যানচেষ্টার থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘জাগরণ’ পত্রিকার প্রেস ও সত্ত্ব কিনে নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশ্ব জনমত গঠন ও প্রবাসী বাঙালিদের মুখপত্র হিসেবে ‘পূর্ববাংলা পাবলিকেশান এন্ড প্রিন্টিং কোম্পানি লি.’ নামে একটি কোম্পানি গঠন করে এর মুখপত্র হিসেবে সাপ্তাহিক ‘বাংলাদেশ’ নামে একখানা পত্রিকা দীর্ঘদিন স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে বের করা হয়। হাফিজ মজির উদ্দিন উক্ত কোম্পানি ও পত্রিকার একজন ডাইরেক্টার হিসেবে পত্রিকাটি দীর্ঘদিন প্রকাশনার ক্ষেত্রে বলিষ্ট ভূমিকা রাখেন।
তিনি ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তৎকালীন ‘পাকিস্তান ওয়েলফেয়ার অ্যাসসিয়েশান’-এর ট্রেজারার, ১৯৮৭ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট। ‘গ্রেটার লন্ডন ক্যাটারার্স অ্যাসোসিয়েশান’-এর অন্যতম ট্রাষ্টি ও বর্তমানে এ সংগঠনের ম্যানেজমেন্ট কমিটির সহ-সভাপতি।
হাফিজ মজির উদ্দিন ১৯৮১ সালে জাতীয় পর্টিতে যোগদান করেন। বর্তমানে জাতীয় পার্টি যুক্তরাজ্য শাখার ভাইস প্রেসিডেন্ট। এছাড়া তিনি ‘ব্রিক লেন জামে মসজিদ”, ফোর্ড স্কোয়ার ‘এশাআতুল ইসলাম মসজিদ ও মাদ্রাসা’-র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছাড়াও যুক্তরাজ্য এবং বাংলাদেশে বিভিন্ন সমাজকল্যাণ ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত।

জাহেদ জারিফ:লেখক ও সাংবাদিক।নিউইয়র্ক।

EFFBA5DE-1AF2-476A-95FB-E10C286F512B

হাফিজ মজির উদ্দিন।

Advertisements
%d bloggers like this: